পদার্থবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য
পদার্থবিজ্ঞানের উদ্দেশ্যকে তিনটি মূলভাগে ভাগ করা যায়-
১. প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন,
২. প্রকৃতির নিয়মগুলো এবং
৩. প্রাকৃতিক নিয়ম ব্যবহার করে প্রযুক্তির বিকাশ।
✅ নিউট্রন ও প্রোটন কোয়ার্ক নামক মৌলিক কণা দিয়ে তৈরি।
✅ ১৯৩৮ সালে বিজ্ঞানী ওটোহান ও স্ট্রেসম্যান ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভেঙে প্রথম আবিষ্কার করেন যে,
পরমাণু ফিশনযোগ্য বা পরমাণুকে বিভাজিত করা সম্ভব।
✅ বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের অন্তর্গত রূপপুর নামক স্থানে
নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।
ভৌত রাশি এবং পরিমাপ – (Physical Quantities and Measurements)
কোনো ভৌত রাশির (যেমন দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, তাপমাত্রা) পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট আদর্শ মানের (একক) সাথে তুলনা করে সাংখ্যিকভাবে প্রকাশ করার প্রক্রিয়াকে পরিমাপ বলে।
দৈনন্দিন জীবন বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোনো কিছুর পরিমাণ, যেমন- ওজন, আয়তন বা সময় নির্ণয় করাই হলো পরিমাপ।
ভৌত রাশি: এই ভৌত জগতে যা কিছু পরিমাপ করা যায় তাকে রাশি বলে।
ভৌত রাশিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১. মৌলিক রাশি (Fundamental Quantities)
২. যৌগিক বা লব্ধ রাশি (Derived Quantities)
১. মৌলিক রাশি: “যে সকল রাশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যা অন্য কোন রাশির উপর নির্ভরশীল নয় তাকে মৌলিক রাশি বলে।” মৌলিক রাশি মোট ৭ টি।
৭ টি মৌলিক রাশির একক ও মাত্রা:

২. লব্ধ রাশিঃ “যে সকল রাশি একাধিক মৌলিক রাশির সমন্বয়ে গঠিত তাদের লব্ধ রাশি বলে।” যেমনঃ বেগ, ত্বরণ ইত্যাদি।
মৌলিক ও লব্ধ রাশির মধ্যে পার্থক্যঃ

পরিমাপের যন্ত্রপাতি
পদার্থবিজ্ঞানে সঠিক পরিমাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ইলেকট্রনিকস নির্ভর যন্ত্রপাতির কারণে এই কাজটি এখন অনেক সহজ হয়েছে। তোমাদের সিলেবাস অনুযায়ী ৫টি প্রধান যন্ত্রপাতির বিবরণ নিচে আলোচনা করা হলো:
মিটার স্কেল (Meter Scale)
সাধারণত দৈর্ঘ্য মাপার জন্য যে স্কেল ব্যবহার করা হয়, তাকে মিটার স্কেল বলে। এর দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০০ সেন্টিমিটার (cm) বা ১ মিটার (m) হয়ে থাকে।
✅ স্কেলটি সাধারণত মিলিমিটার (mm) পর্যন্ত ভাগ করা থাকে।
সীমাবদ্ধতা: সাধারণ মিটার স্কেলে ১ মিলিমিটারের চেয়ে কম বা মিলিমিটারের ভগ্নাংশ মাপা সম্ভব হয় না।

স্লাইড ক্যালিপার্স / ভার্নিয়ার স্কেল (Slide Calipers)
মিটার স্কেলে মিলিমিটারের ভগ্নাংশ মাপা যায় না। এই সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য মূল স্কেলের পাশে একটি নড়াচড়া করতে সক্ষম ছোট স্কেল ব্যবহার করা হয়, যাকে ভার্নিয়ার স্কেল বলে।

ভার্নিয়ার ধ্রুবক (Vernier Constant – VC):
প্রধান স্কেলের ক্ষুদ্রতম এক ভাগের দৈর্ঘ্যের চেয়ে ভার্নিয়ার
স্কেলের এক ভাগের দৈর্ঘ্য যতটুকু ছোট, সেই পার্থক্যকে ভার্নিয়ার ধ্রুবক বলে। একে সংক্ষেপে VC দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কোনো যন্ত্রের ভার্নিয়ার ধ্রুবক যত কম হবে, সেই যন্ত্র দিয়ে তত বেশি সূক্ষ্ম মাপ নেওয়া সম্ভব। স্লাইড ক্যালিপার্স দিয়ে তার ভার্নিয়ার ধ্রুবকের সমান ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য মাপা যায়। সাধারণত ভার্নিয়ার স্কেলের ১০ ভাগ মূল স্কেলের ৯ ভাগের সমান হয়।

ভার্নিয়ারের সমপাতন (Vernier Coincidence- V):
স্লাইড ক্যালিপার্সের সাহায্যে পরিমাপের ক্ষেত্রে
ভার্নিয়ারের যে দাগটি প্রধান স্কেলের কোন দাগের সাথে মিলে থাকে বা কাছাকাছি থাকে ভার্নিয়ার স্কেলের সেই দাগকে ভার্নিয়ারের সমপাতন বলে।
ভার্নিয়ার স্কেল কেন প্রয়োজন
আমরা সাধারণ মিটার স্কেল দিয়ে মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কোনো অংশ (যেমন: ০.৫ mm বা ০.২৫ mm সঠিকভাবে মাপতে পারি না। ভার্নিয়ার ধ্রুবক জানা থাকলে আমরা ভার্নিয়ার স্কেল ব্যবহার করে এই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশগুলোও নিখুঁতভাবে হিসেব করতে পারি।
স্ক্রু গজ (Screw Gauge)
ভার্নিয়ার স্কেলের চেয়েও সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য, যেমন তারের ব্যাসার্ধ বা সরু পাতের বেধ মাপতে স্ক্রু গজ ব্যবহার করা হয়। এটি একটি স্ক্রু বা নাট-বল্টু নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।

পিচ (Pitch – P): বৃত্তাকার স্কেলের একটি পূর্ণ ঘূর্ণনে এটি রৈখিক স্কেল বরাবর যে দূরত্ব অতিক্রম তাকে পিচ বলে। একে P দ্বারা প্রকাশ করা হয়। সাধারণত এটি ১ মি.মি. হয়ে থাকে।
লঘিষ্ঠ গণন বা ন্যূনাঙ্ক (Least Count – LC): বৃত্তাকার স্কেলের মাত্র এক ভাগের ঘূর্ণনে এটি রৈখিক স্কেল বরাবর যে সামান্য দূরত্ব অতিক্রম তাকে লঘিষ্ঠ গণন বলে।
ব্যালেন্স বা ভর মাপার যন্ত্র (Balance)
আমরা সাধারণ মিটার স্কেল দিয়ে মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কোনো অংশ (যেমন: ০.৫ mm বা ০.২৫ mm সঠিকভাবে মাপতে পারি না। ভার্নিয়ার ধ্রুবক জানা থাকলে আমরা ভার্নিয়ার স্কেল ব্যবহার করে এই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশগুলোও নিখুঁতভাবে হিসেব করতে পারি।

পুরানো পদ্ধতি: একসময় নিক্তি ব্যবহার করে বাটখারার সাথে তুলনা করে ভর মাপা হতো।
আধুনিক পদ্ধতি: বর্তমানে ডিজিটাল ইলেকট্রনিক ব্যালেন্স ব্যবহার করা হয়। এতে সেন্সর থাকে যা বস্তুর নিখুঁত ভর ডিসপ্লেতে দেখিয়ে দেয়।
থামা ঘড়ি (Stopwatch)
ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধান মাপার জন্য স্টপ ওয়াচ বা থামা ঘড়ি ব্যবহার করা হয়। কোনো একটি মুহূর্ত থেকে সময় মাপা শুরু করে নির্দিষ্ট কাজ শেষে তা বন্ধ করে অতিক্রান্ত সময় বের করা হয়।

সতর্কতা: স্টপ ওয়াচ অনেক সূক্ষ্ম সময় মাপতে পারলেও, আমাদের হাত দিয়ে বাটন চাপতে যে সময় লাগে (Reaction time), তার কারণে হুবহু নিখুঁত পাঠ নেওয়া কঠিন হতে পারে।
পরিমাপে ত্রুটি ও নির্ভুলতা (Error and Accuracy in Measurement)
কোনো ভৌত রাশি পরিমাপ করার সময় যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা বা ব্যক্তিগত কারণে প্রকৃত মান এবং পরিমাপকৃত মানের মধ্যে যে পার্থক্য বা অসামঞ্জস্য থাকে, তাকে পরিমাপের ত্রুটি বলে।
বাস্তবে কোনো পরিমাপই 100% নির্ভুল হয় না। তাই ফলাফলের নির্ভুলতা বোঝাতে মানের সাথে ‘‘ চিহ্ন দিয়ে সম্ভাব্য ত্রুটি উল্লেখ করতে হয়।

যেমন: 7 ± 0.5 cm লেখার অর্থ হলো, প্রকৃত মান 6.5 cm থেকে 7.5 cm এর মধ্যে যেকোনো কিছু হতে পারে।
Note : সাধারণত স্কেলের বা যন্ত্রের ক্ষুদ্রতম দাগের অর্ধেক মানকে ত্রুটি হিসেবে ধরা হয়।

তিন ধরনের ত্রুটি সম্পর্কে বিস্তারিত
১. যান্ত্রিক ত্রুটি
২.চূড়ান্ত ত্রুটি বা পরম ত্রুটি
৩. আপেক্ষিক ত্রুটি
যান্ত্রিক ত্রুটি (Instrumental Error): পরিমাপক যন্ত্রের নিজস্ব ত্রুটির কারণে যে ভুল হয়, তাকে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে। যান্ত্রিক ত্রুটি ঋণাত্মক বা ধনাত্মক হতে পারে।
চূড়ান্ত ত্রুটি বা পরম ত্রুটি (Absolute Error): কোনো একটি পরিমাপে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ যে পরিমাণ ত্রুটি হতে পারে, তাকে চূড়ান্ত বা পরম ত্রুটি বলে।
ব্যাখ্যা: উপরের উদাহরণে (7±0.5 cm), এখানে চূড়ান্ত ত্রুটি হলো 0.5 cm। অর্থাৎ, পরিমাপকৃত মানটি প্রকৃত মান থেকে সর্বোচ্চ 0.5 cm বেশি বা কম হতে পারে।
আপেক্ষিক ত্রুটি (Relative Error): প্রতি একক পরিমাপে যতটুকু ত্রুটি থাকে, তাকে আপেক্ষিক ত্রুটি বলা হয়। পরিমাপটি কতটা নিখুঁত, তা আপেক্ষিক ত্রুটি দিয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়।

তাহলে আমরা লিখতে পারি, পরিমাপের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ত্রুটি ও পরিমাপ করা মানের অনুপাতকে আপেক্ষিক ত্রুটি বলে। অর্থাৎ,
আপেক্ষিক ত্রুটি
আপেক্ষিক ত্রুটিকে শতকরা হিসেবেও প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে,
শতকরা আপেক্ষিক ত্রুটি = × 100%
আপেক্ষিক ত্রুটির Concept
ধরি, 2 mm দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য পরিমাপে ± 0.5 mm ত্রুটি হয়। আবার ধরি, 2 m দৈর্ঘ্যের অন্য একটি বস্তুর দৈর্ঘ্য পরিমাপে ± 0.5 mm ত্রুটি হয়। খেয়াল করে দেখো, উভয় ক্ষেত্রে সমান পরিমাণ ত্রুটি হয়। কিন্তু প্রথম বস্তুটির জন্য এই ত্রুটি অনেক গুরুতর। কারণ 2 mm দৈর্ঘ্য মাপতে গিয়ে 0.5 mm ত্রুটি হয়েছে। কিন্তু 2 m দৈর্ঘ্যের বস্তুটির জন্য 0.5 mm ত্রুটি খুবই নগণ্য। তাই কোনো রাশি পরিমাপে ত্রুটি কতটুকু গুরুতর তা বোঝানোর জন্য আপেক্ষিক ত্রুটি ব্যবহৃত হয়। আপেক্ষিক ত্রুটি কে নিম্নরূপে প্রকাশ করা হয়,
উপরোক্ত দুটি উদাহরণের জন্য শতকরা আপেক্ষিক ত্রুটি হলো:

সুতরাং আপেক্ষিক ত্রুটি থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে, কোনো রাশি পরিমাপের ক্ষেত্রে ত্রুটি কত গুরুতর।
এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন
দৃষ্টকল্প-১: একটি স্লাইড ক্যালিপার্সের প্রধান স্কেলের ক্ষুদ্রতম ঘরের দৈর্ঘ্য 1 mm এবং ভার্নিয়ার ধ্রুবক 0.005 cm। এর সাহায্যে একটি ঘনকের আয়তন পরিমাপে ঘনকের এক বাহুর দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে পাওয়া গেল 7.48 cm যেখানে প্রধান স্কেলের পাঠ 7.4 cm। দৈর্ঘ্য পরিমাপে 7% ত্রুটি বিদ্যমান। এছাড়া সমান পুরুত্বের ঘনকাকৃতির একটি লোহার ফাঁপা বক্সের বাইরের ও ভিতরের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ও
উক্ত স্লাইড ক্যালিপার্স দিয়ে l₁ ও l₂ পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রধান স্কেল পাঠ যথাক্রমে 80 mm ও 60 mm এবং ভার্নিয়ার সমাপতন 9 ও 6।
দৃষ্টকল্প-২: স্ক্রু-গজের সাহায্যে একটি গোলকের ব্যাস পরিমাপে প্রধান স্কেল পাঠ 2 mm পাওয়া গেল। বৃতাকার স্কেলের 20 তম ভাগ রৈখিক স্কেলের সাথে মিলে যায়। বৃতাকার স্কেলের মোট ভাগ সংখ্যা 100 এবং পিচ 1 mm।
(1 cc গোলকের ভর = 1 gm)
প্রশ্নসমূহ:
1. দৃষ্টকল্প-১ এ ঘনকের আয়তন পরিমাপের ক্ষেত্রে ভার্নিয়ার সমাপতন নির্ণয় কর।
2. দৃষ্টকল্প-১ এর স্লাইড ক্যালিপার্সটির ভার্নিয়ার স্কেল কত ভাগে মূল স্কেলের কত ভাগের সমান নির্ণয় কর।
3. দৃষ্টকল্প-১ এ ঘনকের আয়তন ও এক পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল পরিমাপে পরিমাপটির যন্ত্রের নির্ভুলতায় হবে কি-না—গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ কর।
4.দৃষ্টকল্প-১ এর ক্ষেত্রে এর মান নির্ণয় কর।
5. 1 ঘন সেমি. লোহার ভর 7.2 গ্রাম হলে, দৃষ্টকল্প-১ এর বক্সের লোহার ভর 2 kg এর বেশি হবে কিনা—গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ কর।
6. দৃশ্যকল্প-২ এর স্ক্রুগজের নূনাঙ্ক নির্ণয় কর।
7. দৃশ্যকল্প-২ এর নির্দিষ্ট ভরের গোলকের ব্যাস পরিমাপে আপেক্ষিক ত্রুটি 5% হলে ঘনত্ব পরিমাপে আপেক্ষিক ত্রুটির শতকরা পরিমাণ নির্ণয় কর।
8. দৃশ্যকল্প-১ ও দৃশ্যকল্প-২ এর যন্ত্র দুটির মধ্যে কোনটি অধিকতর সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্য পরিমাপে সহায়ক?
বিশ্লেষণ করে মতামত দাও।


