রাসায়নিক বন্ধন
যোজ্যতা ইলেকট্রন (Valence electron):
কোন মৌলের সর্বশেষ প্রধান শক্তিস্তরের মোট ইলেকট্রন সংখ্যাকে সেই মৌলের যোজনী ইলেকট্রন বা যোজ্যতা ইলেকট্রন বলে। শেষ কক্ষপথকে যোজনী শেল বলা হয়।
✅️যোজনী ইলেকট্রন সংখ্যা হতে সহজেই কোন মৌলের যোজনী বের করা যায়।

পটাশিয়ামের ও অক্সিজেনের ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্বশেষ কক্ষপথে যথাক্রমে ১টি ও ৬টি করে ইলেকট্রন বিদ্যমান। সুতরাং, K এর যোজতা ইলেকট্রন ১টি ও অক্সিজেনের (O) এর যোজতা ইলেকট্রন ৬টি।
Example-1 :
Li, Na, O, F এর কোনটির যোজতা ইলেকট্রন কত ?
Na(11) → 2, 8, 1 ⇒ Na এর যোজতা ইলেকট্রন ১টি
Li(3) → 2, 1 ⇒ Li “ “ “ ১টি
O(8) → 2, 6 ⇒ O এর যোজতা ইলেকট্রন ৬টি
F(9) → 2, 7 ⇒ F “ “ “ ৭টি
সুতরাং, কোন মৌলের সর্বশেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন সংখ্যাই ঐ মৌলের যোজতা ইলেকট্রন।
যোজনী এবং যোজ্যতা
যোজনী : কোন ধাতব মৌলের সবচেয়ে বাইরের স্তরের ইলেকট্রন সংখ্যা এবং কোন অধাতব মৌলের সবচেয়ে বাইরের স্তরের বিজোড় ইলেকট্রন সংখ্যাকে যোজনী বলে।
যোজ্যতা : কোন মৌলের সবচেয়ে বাইরের স্তরের সর্বমোট ইলেকট্রন সংখ্যাকে ঐ মৌলের যোজতা বলে।

এখানে এর সবচেয়ে বাইরের স্তরের মোট ইলেকট্রন সংখা 6, তাই এর যোজ্যতা 6 এবং
এর সবচেয়ে বাইরের স্তরের বিজোড় ইলেকট্রন সংখ্যা ২টি, তাই এর যোজনী 2 এবং অক্সিজেন একটি অধাতু।
ব্যাখ্যা: সাধারণত মৌলের যোজনী তার যোজ্যতা ইলেকট্রন সংখ্যার সমান হয়। অথবা, ৪ হতে যোজ্যতা ইলেকট্রন সংখ্যা বাদ দিলে যে সংখ্যা থাকে তার সমান হয়। এর কারণ হচ্ছে যৌগ গঠন করার সময়ে নিস্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করতে যে কয়টি ইলেকট্রন বর্জন-গ্রহণ বা শেয়ার করে সেই সংখ্যা ঐ মৌলের যোজনী নির্দেশ করে।
✅️কোন মৌলের একটি পরমাণু যতগুলো ঐ পরমাণু বা H পরমাণু বা Cl পরমাণুর সাথে যুক্ত হতে পারে সেই সংখ্যাই হলো ঐ মৌলের যোজনী বা যোজ্যতা। এবং H পরমাণুর যোজনী সর্বদা 1 ধরা হয়।
✅️কোন পরমাণুর সাথে যতটি অক্সিজেন পরমাণু যুক্ত হয় তার সংখ্যার দ্বিগুণ করলে ঐ পরমাণুর যোজনী বা যোজ্যতা হয়। Note: H এর যোজনী সর্বদা 1 ধরা হয়।
Example:
✅️HCI অণুতে, একটি H পরমাণুর সাথে 1টি Cl পরমাণু যুক্ত হয়েছে তাই ক্লোরিনের যোজনী 1।
✅️H₂O অণুতে ০ এর একটি পরমাণু H এর 2 টি পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়েছে তাই অক্সিজেনের যোজনী 21
✅️CaO – ক্যালসিয়ামের (Ca) একটি পরমাণু একটি অক্সিজেন (০) পরমাণুর সাথে যুক্ত এবং ০ পরমাণুর সংখ্যা 1। এই সংখ্যাকে দ্বিগুণ করলে হয় 2। কাজেই Ca এর যোজনী 2।
✅️NaCl – একটি Na পরমাণু একটি CL পরমাণুর সাথে যুক্ত। সুতরাং, Na এর যোজনী 1।
সুপ্ত যোজনী
কোন মৌলের একাধিক যোজনী থাকলে সেই মৌলের যোজনীকে পরিবর্তনশীল যোজনী বলে। যেমন: Fe এর পরিবর্তনশীল যোজনী 2 এবং 3।
কোন মৌলের সর্বোচ্চ যোজনী ও সক্রিয় যোজনীর পার্থক্যকে ঐ মৌলের সুপ্ত যোজনী বলে।
যেমন: FeCl₂ যৌগে Fe এর সক্রিয় যোজনী 2 কিন্তু Fe এর সর্বোচ্চ যোজনী ও। অতএব FeCl₂ যৌগে Fe এর সুপ্ত যোজনী 3 – 2 = 1।
যৌগমূলক ও তাদের যোজনী
সংজ্ঞা: একাধিক মৌলের কতিপয় পরমাণু বা আয়ন পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে ধনাত্মক বা ঋনাত্মক আধানবিশিষ্ট একটি পরমাণুগুচ্ছ তৈরি করে এবং একটি মৌলের আয়নের ন্যায় আচরণ করে। এ ধরনের পরমাণুগুচ্ছকে যৌগমূলক বলে।
যৌগমূলক ঋনাত্মক কিংবা ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হতে পারে এদের আধান সংখ্যাই মূলত এদের যোজনী নির্দেশ করে।
Example: এ একটি N পরমাণুর সাথে তিনটি H পরমাণু ও একটি H+ যুক্ত হয়ে অ্যামোনিয়াম (NH4+) আয়ন নামক যৌগমূলকের সৃষ্টি করে। এর আধান সংখ্যা +1। সুতরাং, এর যোজনী যোজনী এক (1)।
বিভিন্ন যৌগমূলকের নাম, সংকেত, আধান ও যোজনী

যৌগের রাসায়নিক সংকেত
মৌল বা যৌগমূলকের প্রতীক বা সংকেত ও তাদের সংখ্যার মাধ্যমে কোন যৌগ অণুকে প্রকাশ করাই হলো উক্ত যৌগের রাসায়নিক সংকেত।
যৌগের একটি অণুতে যেসব পরমাণু থাকে তাদের প্রতীক ও সংখ্যার মাধ্যমে অণুটিকে প্রকাশ করা হয়।
যেমন: H₂O হলো পানির অণুর রাসায়নিক সংকেত।
এক্ষেত্রে অণুর মধ্যে অবস্থিত মৌলের বা যৌগমূলকের সংখ্যাকে সংকেতের নিচে ডান পাশে ছোট করে লেখা হয়।
রাসায়নিক সংকেত লেখার নিয়ম
✅️ কোন মৌলের একটি অণুতে যতগুলো পরমাণু থাকে তার সংখ্যাকে ইংরেজীতে মৌলটির প্রতীকের ডান পাশে নিচে ছোট করে লেখা হয়।
> নাইট্রোজেন অণুর সংকেত N₂ । এরকম আরও H2, 021
> ওজোন এর একটি অণুতে তিনটি অক্সিজেন পরমাণু থাকে। তাই ওজোন অণুর সংকেত ।
> কিছু মৌল অণু গঠন করেনা তাই তাদেরকে শুধু প্রতীক দিয়ে বোঝানো হয়।
যেমন: সকল ধাতু। আয়রনকে বোঝাতে শুধু Fe লিখতে হবে। এছাড়াও Na, Ca, K ইত্যাদি।
✅️ কখনো কখনো কোন যৌগের অণু ২টি ভিন্ন মৌলের পরমাণু দিয়ে গঠিত হয়। তাদের যোজনী যদি কোনো সাধারণ সংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য না হয় তাহলে দুটি মৌলের প্রতীক পাশাপাশি লিখে একটি মৌলের প্রতীকের পাশে অন্যটির যোজনী লিখতে হয়। যেমন: Al2O3, CaCl21
> কোন যৌগমূলক একাধিক সংখ্যক থাকলে যৌগমূলকটিকে প্রথম বন্ধনীর মধ্যে রেখে তারপর সংখ্যা
লিখতে হয়। যেমন: অ্যামোনিয়াম ফসফেট (NH4)3(PO4)
✅️ যদি দুটি মৌলের যোজনী কোন সাধারণ সংখ্যা দিয়ে বিভাজ্য হয় তাহলে যোজনীগুলো সেই সাধারণ সংখ্যা দিয়েই ভাগ দিয়ে মৌলের পাশে পূর্বের নিয়মে ভাগফলটি লিখতে হয়। যেমন: CO2, FeSO4
আণবিক সংকেত ও গাঠনিক সংকেত
আণবিক সংকেত: একটি মৌল বা যৌগের অণুতে যে যে ধরনের মৌলের পরমাণু থাকে তাদের প্রতীক এবং সেই মৌলের যতটি পরমাণু থাকে সেই সকল সংখ্যা দিয়ে প্রকাশিত সংকেতকে আণবিক সংকেত বলে।
ব্যাখ্যা: প্রোপেন (C3Hg) এ তিনটি কার্বন (C) পরমাণু আটটি (৪) হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়েছে। এবং C3Hg গঠন করেছে। প্রোপেনের (C3Hg) এই সংকেতকে তার আণবিক সংকেত বলে।
গাঠনিক সংকেত: একটি অণুতে মৌলের পরমাণুগুলো যেভাবে সাজানো থাকে প্রতীক এবং বন্ধনের মাধ্যমে তা প্রকাশ করাকে গাঠনিক সংকেত বলে।
ব্যাখ্যা: C3H8 যৌগে কার্বন পরমাণু তিনটি একে অপরের সাথে শিকল আকারে যুক্ত হয় এবং অবশিষ্ট যোজনীগুলো হাইড্রোজেন দ্বারা পূর্ণ হয়ে প্রতিটি কার্বনের যোজনী 4 হয়।
প্রোপেনের গাঠনিক সংকেত :

পানির আণবিক সংকেত H₂O, অতএব এর গাঠনিক সংকেত :

মিথেনের আণবিক সংকেত CH4, অতএব এর গাঠনিক সংকেত :

Note:
এখানে কার্বন- কার্বন হাইড্রোজেনের মধ্যে অবস্থিত প্রতিটি রেখা হলো একেকটি বন্ধন। এরা সমযোজী বন্ধন। গাঠনিক সংকেতের মাধ্যমে যৌগের অণুতে কোন পরমাণু কতটি করে আছে এবং তারা একে অপরের সাথে কিভাবে যুক্ত আছে তা জানা যায়।
অষ্টক ও দুই এর নিয়ম
অষ্টক নিয়ম: প্রতিটি মৌলেই তার সর্বশেষ শক্তিস্তরে নিস্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাসের প্রবণতা দেখায়। ” অণু গঠনকালে কোন মৌল ইলেকট্রন গ্রহণ-বর্জন অথবা ভাগাভাগির মাধ্যমে তার সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৮টি করে ইলেকট্রন ধারনের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করে। একেই অষ্টক নিয়ম বলা হয়।
ব্যাখ্যা:

অণুতে কেন্দ্রীয় পরমাণু কার্বনের সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৪ টি ইলেকট্রন বিদ্যমান যেখানে 4 টি ইলেকট্রন কার্বনের নিজস্ব আর বাকি চারটি ইলেকট্রন হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে আসে। এভাবে পরমাণুসমূহ তার সর্বশেষ শক্তিস্তরে ইলেকট্রন ভাগাভাগি আদান-প্রদানের মাধ্যমে ৪ টি ইলেকট্রন ধারণ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের মাধ্যমে যৌগ গঠনের পদ্ধতিকে অষ্টক নিয়ম বলে।
Note:
i. হিলিয়াম (He) ছাড়া সকল নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৮টি করে ইলেকট্রন বিদ্যমান।
ii. পর্যায় সারনির 1-20 পর্যন্ত মৌলগুলো ‘অষ্টক’ নিয়ম ভালোভাবে অনুসরণ করে।
অষ্টক নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম
SF₄, PCl₅, BF₃, LiF উক্ত যৌগগুলো অষ্টক নিয়ম মেনে চলে না।
SF₄ অষ্টক নিয়ম না মানার কারণ :
⇒ S(16) = 1s²2s²2p⁶3s²3p⁴
F(9) = 1s²2s²2p⁵
বিভিন্ন মৌলের পরমাণুসমূহ নিজেদের মধ্যে ইলেকট্রন আদান-প্রদান এবং শেয়ারের মাধ্যমে পরমাণুগুলোর শেষ শক্তিস্তরে অষ্টক ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করে। একে অষ্টক নিয়ম বলে।
SF₄ যৌগে ১টি সালফার পরমাণু ৪টি ফ্লোরিন পরমাণুর সাথে ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে যৌগ গঠন করে। ফলে, প্রতিটি F পরমাণুর অষ্টক পূর্ণ হতে S এর সর্বমোট শক্তিস্তরে ১০টি ইলেকট্রন পাওয়া যায় অর্থাৎ, ‘S’ পরমাণু তার অষ্টক নিয়ম অনুসরণ করেনি। একে অষ্টক সম্প্রসারণ বলে।
দ্বৈত এর নিয়ম
সংজ্ঞা : নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সর্বশেষ শক্তিস্তরে প্রথম ২টি বা ৮টি করে ইলেকট্রন বিদ্যমান। তেমনি অণু গঠনে কোন পরমাণু সর্বশেষ শক্তিস্তরে এক বা একাধিক জোড়া ইলেকট্রন বিদ্যমান থাকে, দ্বৈত এর নিয়ম।

ব্যাখ্যা : BeCl₂ যৌগে কেন্দ্রীয় পরমাণু Be এর সর্বশেষ শক্তিস্তরে ২ জোড়া অর্থাৎ ৪টি ইলেকট্রন বিদ্যমান। Cl এর সাথে শেয়ারের ফলে Be এর সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৪টি ইলেকট্রন পাওয়া যায়। দ্বৈত এর নিয়ম অনুসরণ করেনি।
অর্থাৎ, অনুতে যেকোন পরমাণুর সর্বশেষ শক্তিস্তরে এক বা একাধিক জোড়া ইলেকট্রন অবস্থান করবে।
Note:
i. পর্যায় সারণির ১-২০ পর্যন্ত মৌলসমূহ দ্বৈত এর নিয়ম ভালোভাবে অনুসরণ করে।
ii. অষ্টক নিয়মের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে বিজ্ঞানীরা ‘দ্বৈত এর নিয়ম’ উদ্ভাবন করেন।
নিষ্ক্রিয় গ্যাস ও ইলেকট্রন বিন্যাস
He(2) → 1s²
Ne(10) → 1s²2s²2p⁶
Ar(18) → 1s²2s²2p⁶3s²3p⁶
Kr(36) → 1s²2s²2p⁶3s²3p⁶3d¹⁰4s²4p⁶
Xe(54) → 1s²2s²2p⁶3s²3p⁶3d¹⁰4s²4p⁶4d¹⁰5s²5p⁶
Rn(86) → 1s²2s²2p⁶3s²3p⁶3d¹⁰4s²4p⁶4d¹⁰4f¹⁴5s²5p⁶5d¹⁰6s²6p⁶
নিষ্ক্রিয় পরমাণুগুলোর ইলেকট্রন বিন্যাসে দেখা যায় যে,
✅️হিলিয়ামের সর্বশেষ শক্তিস্তরে ২টি ইলেকট্রন রয়েছে। হিলিয়ামের সর্বশেষ শক্তিস্তর পূর্ণ করতে ২টি ইলেকট্রনই প্রয়োজন, কাজেই এর ইলেকট্রন বিন্যাস স্থিতিশীল।
✅️অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসের বেলায় তাদের সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৮টি (ns²np⁶) করে ইলেকট্রন বিদ্যমান। কোনো কারণে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করলে তারা সর্বাধিক স্থিতিশীল হয়।
✅️অন্যান্য মৌল স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য তাদের সর্বশেষ শক্তিস্তরে দ্বৈত বা অষ্টক পূর্ণ করতে চায়। এজন্য তারা সর্বশেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন ত্যাগ, আদান-প্রদান বা ভাগাভাগি করে যৌগ গঠন করে।
রাসায়নিক বন্ধন ও আয়নিক বন্ধন গঠনের কারণ
সংজ্ঞা : অণুতে পরমাণুগুলোর যে আকর্ষণের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে তাকেই রাসায়নিক বন্ধন বলে।
রাসায়নিক বন্ধন গঠনের মূল কারণ : রাসায়নিক বন্ধন গঠনে সর্বশেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রনগুলো নিষ্ক্রিয় গ্যাসের স্থিতিশীল ইলেকট্রন বিন্যাস (দ্বৈত বা অষ্টক) অর্জন করতে চায়।
যেমন: H₂ অণু গঠনের ক্ষেত্রে দুটি H পরমাণু ১টি করে ইলেকট্রন শেয়ারের করে।
এভাবে ইলেকট্রন আদান-প্রদান বা শেয়ারের মাধ্যমে বন্ধন গঠিত হয়।
রাসায়নিক বন্ধন গঠনের প্রয়োজনীয় তথ্য :
i. কোন মৌলের শেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন বন্ধন গঠনে অংশগ্রহণ করে।
ii. প্রতিটি পরমাণুই লক্ষ্য থাকে তার নিকটবর্তী নিষ্ক্রিয় মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করা।
iii. 1-17 পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট মৌলসমূহ বন্ধন গঠনে খুব সহজেই দ্বৈত বা অষ্টক নিয়ম অনুসরণ করে।
ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন
ক্যাটায়ন : ধনাত্মক চার্জযুক্ত পরমাণুকে ক্যাটায়ন বলে।
ব্যাখ্যা : একটি আয়ন নিরপেক্ষ পরমাণুর বাইরের শক্তিস্তর থেকে এক বা একাধিক ইলেকট্রন সরিয়ে নিলে পরমাণুটি আর আয়ন নিরপেক্ষ থাকবে না। এটি সাধারণভাবে ধনাত্মক আয়নবিশিষ্ট আয়নে পরিণত হবে।
যে সকল মৌলের শেষ শক্তিস্তরে কম সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে সে সকল মৌলের ইলেকট্রন ঐ পর্যায়ের অন্যান্য মৌলের তুলনায় নিউক্লিয়াস থেকে দূরে অবস্থানের কারণে নিউক্লিয়াসের সাথে দুর্বলভাবে আকর্ষিত হয় এবং ইলেকট্রন অপসারণ করে দ্বৈত বা অষ্টক পূর্ণ করতে চায়।

চিত্র:- লিথিয়াম ক্যাটায়ন (Li⁺)
Li পরমাণু তার সর্বশেষ শক্তিস্তরের একটি ইলেকট্রন ত্যাগ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম (He) এর ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জনের মাধ্যমে Li⁺ ক্যাটায়ন (Li⁺) গঠন করে।
অ্যানায়ন : ঋণাত্মক চার্জযুক্ত পরমাণুকে অ্যানায়ন বলে।
ব্যাখ্যা : যে সকল মৌলের শেষ শক্তিস্তরে অষ্টক অপূর্ণ সাধারণত ১, ২ বা ৩ টি ইলেকট্রন কম থাকে। তারা সেই সংখ্যক ইলেকট্রন গ্রহণ করে সহজেই নিষ্ক্রিয় গ্যাসীয় স্থিতিশীল ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করে। অন্যভাবে বলা যায় তাদের ইলেকট্রন ত্যাগের পরিবর্তে ইলেকট্রন গ্রহণের প্রবণতা বেশি। এদের নিউক্লিয়াস অপেক্ষাকৃত প্রোটন সংখ্যার চেয়ে ইলেকট্রন আধিক্যবিশিষ্ট ও এর ঋণাত্মক বেশি হয়। তাই সাধারণভাবে অধিক পরমাণুগুলো ঋণাত্মক আয়নবিশিষ্ট হয়। এদের ঋণাত্মক আয়নবিশিষ্ট অধিক পরমাণুকে অ্যানায়ন বলে।
যেমন :

ক্লোরিন (Cl) পরমাণু একটি ইলেকট্রন গ্রহণ আয়নবিশিষ্ট নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গনের (Ar) ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের মাধ্যমে ক্লোরাইড (Cl⁻) আয়ন তৈরি করে।
আয়নিক বন্ধন বা তড়িৎযোজী বন্ধন
সংজ্ঞা : ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে গঠিত ক্যাটায়ন ও অ্যানায়নসমূহ যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বল দ্বারা যুক্ত থাকে তাকে আয়নিক বন্ধন বলে।
ব্যাখ্যা : ধাতুগুলোর আয়নীকরণ শক্তি কম হওয়ার কারণে এরা অতি সহজেই সর্বশেষ শক্তিস্তরের এক বা একাধিক ইলেকট্রন ত্যাগ করে ধনাত্মক আয়ন বা ক্যাটায়ন গঠিত হয়। আবার অধাতুগুলোর ইলেকট্রন গ্রহণ প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আয়ন বা অ্যানায়ন গঠিত হয়। এভাবে সৃষ্ট বিপরীত আধানবিশিষ্ট ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন স্থির তড়িৎ আকর্ষণে পরস্পর বল দ্বারা আবদ্ধ থাকে। আর এই বলের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে। এটিই আয়নিক বন্ধন।
যেমন : MgO যৌগের আয়নিক বন্ধন –

MgO অণুতে Mg ২টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাস Ne এর মতো ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করে অর্থাৎ সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৪ টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে Mg²⁺ এ পরিণত হয়।
আবার, O পরমাণু ঐ ২ টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাস Ne এর মতো ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করে অর্থাৎ সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৪ টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে O²⁻ এ পরিণত হয়।
এবার Mg²⁺ এবং O²⁻ কাছাকাছি এসে আয়নিক বন্ধন গঠন করে।
ব্যতিক্রম: (i) 13 নং গ্রুপের Al মৌলটি ১ ও ২ নম্বর গ্রুপের মৌল না হওয়া সত্ত্বেও আয়নিক বন্ধন তৈরি করে।
সমযোজী বন্ধন
সংজ্ঞা : পরমাণুগুলোর সর্বশেষ শক্তিস্তরে স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের জন্য ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে বন্ধন গঠিত হয়, একে সমযোজী বন্ধন বলে।
ব্যাখ্যা : সমযোজী বন্ধনে পরমাণুগুলো ইলেকট্রন শেয়ার করে, তাদের শেষ আয়তনে ইলেকট্রনের উন্নত বিন্যাসের কাছাকাছি অবস্থান করে। পরমাণুগুলো ইলেকট্রন শেয়ার করে নির্দিষ্ট গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করে এবং স্থিতিশীলতা লাভ করে। ফলে পরমাণুগুলো তাদের সর্বশেষ শক্তিস্তরে ইলেকট্রন শেয়ার করে সমযোজী বন্ধন সৃষ্টি করে।
যেমন :

চিত্র : H অণুতে সমযোজী বন্ধন গঠন
H পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো, H(1) → 1s¹। দুটি H পরমাণু যখন কাছাকাছি আসে তখন পরমাণুদ্বয় একটি করে ইলেকট্রন শেয়ার করে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন করে। অর্থাৎ সর্বশেষ শক্তিস্তরে ২ টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে সমযোজী বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
আয়নিক ও সমযোজী বন্ধনের বৈশিষ্ট্য
গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক :
➤ আয়নিক যৌগে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়ন থাকে। এ আয়নসমূহ পরস্পরের সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ থাকে।
➤ আয়নিক যৌগে এরা অসংখ্য ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়ন পরস্পরের কাছাকাছি থেকে ত্রিমাত্রিকভাবে সুবিন্যস্ত হয়ে জটিল গঠন তৈরি করে। এতে তাদের আন্তঃআয়নিক আকর্ষণ বল অনেক বেশি হয়।
➤ ফলে তাদেরকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরাতে অনেক বেশি তাপের প্রয়োজন হয়। কাজেই তাদের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক বেশি।
অপরদিকে,
➤ সমযোজী অণুগুলোর মধ্যে আন্তঃ আণবিক আকর্ষণ মূলত দুর্বল ভ্যানডারওয়ালস বলের কারণে হয়ে ওঠে। কাজেই এতে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল অনেক কম।
➤ এজন্য তাদের সামান্য তাপ প্রয়োগ করলেই এরা পরস্পরের থেকে দূরে সরে যায়। অর্থাৎ এদের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক কম।
দ্রাব্যতা/দ্রবণীয়তা :-
➤ পানিতে আয়নিক যৌগ যোগ করলে পানির অণুর ধনাত্মক প্রান্ত আয়নিক যৌগের ঋণাত্মক প্রান্ত বা অ্যানায়নকে আকর্ষণ করে।
➤ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সকল আয়নিক যৌগ পানিতে দ্রবণীয়।
➤ AgCl আয়নিক যৌগ হওয়া সত্ত্বেও তা পানিতে অদ্রবণীয় অবস্থায় থাকে।
অপরদিকে,
➤ সমযোজী যৌগে আয়নিক যৌগের মত ধনাত্মক – ঋণাত্মক প্রান্তের সৃষ্টি হয়না, ফলে আকর্ষণ – বিকর্ষণ ঘটেনা।
➤ সমযোজী যৌগটি পানিতে আয়ন আকারে ভাঙেনা, ফলে সমযোজী যৌগটি পানিতে অদ্রবণীয় হয়না।
➤ তবে কিছু কিছু সমযোজী যৌগে আংশিক ধনাত্মক – ঋণাত্মক প্রান্তের সৃষ্টি হয় অর্থাৎ পোলারিটি দেখা যায়।
যেমন : ইথানল (C₂H₅OH), HCl ইত্যাদি।
বিদ্যুৎ পরিবাহিতা
আয়নিক যৌগ :
➤ আয়নিক যৌগ জলীয় দ্রবণে বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
➤ খাদ্য লবণে (NaCl) জলীয় দ্রবণে ধনাত্মক আয়ন হিসেবে (Na⁺) ও ঋণাত্মক আয়ন হিসেবে (Cl⁻) বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
➤ যেহেতু জলীয় দ্রবণে আয়নিক যৌগসমূহ বিচ্ছিন্ন ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়ন হিসেবে অবস্থান করে কাজেই সকল আয়নিক যৌগ জলীয় দ্রবণে বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
➤ For example CaCl₂ দ্রবণে, Ca²⁺ ও Cl⁻ থাকে এরা বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
সমযোজী যৌগ :
➤ সমযোজী যৌগসমূহ বিদ্যুৎ পরিবহন করে না।
➤ বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়ন এ যৌগে নেই।
➤ সমযোজী যৌগ বিচ্ছিন্ন আয়ন তৈরি হয়না ; আর দ্রবণে আয়ন না থাকলে তা কখনো বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না।
Note: আয়নিক যৌগ কঠিন অবস্থায় তড়িৎ পরিবহন করে না ; শুধুমাত্র জলীয় দ্রবণে বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
ধাতব বন্ধন
সংজ্ঞা : ধাতুর পরমাণুসমূহ যে আকর্ষণ বল দ্বারা পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে তাকে ধাতব বন্ধন বলে।
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ একখন্ড ধাতুর মধ্যে পরমাণুসমূহ যে আকর্ষণের মাধ্যমে যুক্ত থাকে সেটাই ধাতব বন্ধন।
➤ তামার (কপার) তার লোহার (আয়রন) তৈরি ছুরি, কাঁটি অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি জানালা। সোনার অলংকার এর মধ্যে একই ধাতুর অসংখ্য পরমাণু পরস্পরের সাথে ধাতব বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
➤ ধাতুতে পরমাণুসমূহ তার সর্বশেষ শক্তিস্তরের এক বা একাধিক ইলেকট্রনকে ত্যাগ করে ধনাত্মক আয়নে পরিণত হয় ; এই ধনাত্মক আয়নকে পারমাণবিক শাঁস বলে।
➤ ধাতুর পরমাণু কর্তৃক ত্যাগকৃত ইলেকট্রনগুলো শাঁসের মধ্যবর্তী স্থানে ঘোরাফেরা করে যাদের সংযোজনশীল ইলেকট্রন বলে।
ধাতুর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা এবং ধাতুর তাপ পরিবাহিতা
➤ এক খন্ড ধাতুর প্রান্তের এক প্রান্তকে আগুনের উপর রেখে উত্তপ্ত করলে দেখা যাবে অপর প্রান্তটি বেশ তাড়াতাড়ি গরম হতে শুরু করেছে, এর অর্থ ধাতুগুলো তাপ পরিবাহিতা প্রদর্শন করে।
➤ সংযোজনশীল ইলেকট্রন শক্তি গ্রহণ করে এবং তাদের গতিবেগ বেড়ে যায় এবং ইলেকট্রনগুলো অধিক তাপশক্তি গ্রহণ করে দ্রুত অপসারণ প্রান্তের দিকে স্থানান্তরিত হয়, এর ফলে ধাতুর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে তাপের পরিবহন ঘটে।


